বেকারত্ব দূর করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়া।

 Ankhi Jannat   28 October 2019

দেশের একাডেমিক শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ নিয়েও বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে শিক্ষার্থী, চাকরি মিলছে না। স্নাতকোত্তর পাশের পর তিন থেকে চার বছর আবার চাকরির জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। করতে হচ্ছে কোচিংও। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদটা আসলে কোথায়?
অন্যদিকে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আছে বাণিজ্য করার দীর্ঘদিনের অভিযোগ। কিভাবে বাণিজ্য থেকে এসব প্রতিষ্ঠানকে বের করা যায়?
কিভাবে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করা যায়? কিভাবে তরুণ সমাজের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়া নীতি-নৈতিকতা জাগ্রত করা যায়?
এসব প্রশ্নের সুলোক সন্ধানে একুশে টেলিভিশন অনলাইন মুখোমুখি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজীম উদ্দীন খানের
একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা আজও নিশ্চিত করতে পারি নাই যে, আমাদের যে জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে সে জনগোষ্ঠীকে কি ধরণের শিক্ষা দেব? চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনটা বেশি উপযোগী তাও আমরা নির্ধারণ করতে পারি নাই। আমাদের জীবন মানের যে গুণগত দিক বা বেকারত্ব দূর করার জন্য আমাদের আর্থ-সামাজিক চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে কি ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা উচিত সে ব্যাপারেও কোনো পদক্ষেপ নেই। তাই বেকারত্ব দূর করতে জীবনমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
দুই পর্বের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক রিজাউল করিম। পাঠকের উদ্দেশ্যে প্রথম পর্বটি আজ তুলে ধরা হলো-
একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখেরও বেশি। বিবিএসের রিপোর্ট অনুযায়ী গত এক বছরে আরও ৮০ হাজার বেকার বেড়েছে। দেশের এই বিশাল জনশক্তিকে আমরা কেন কাজে লাগাতে পারছি না? কেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না? কেন আমরা বেকার থাকছি?
তানজীম উদ্দীন খান: ছেলে-মেয়ে পাশ করে বের হচ্ছে কিন্তু চাকরি পাচ্ছে না। এটা খুবই স্বাভাবিক চিত্র। এর দুটো কারণ আছে। একটি কারণ হচ্ছে-চাকরির ক্ষেত্রে যে ধরণের দক্ষতা জরুরী, বিশেষ করে আমাদের ছেলে-মেয়েদের লেখা-পড়া ও ভাবনার যে দক্ষতা, সেটার ঘাটতি তো থাকেই।
কিন্তু শুধু যে এটার জন্য বেকারত্ম বাড়ছে তা না। এটার জন্য আমাদের যে উন্নয়ন ভাবনা, এ উন্নয়ন ভাবনা বাংলাদেশের যে আর্থ-সামাজিক চিত্র, সে চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্ব না।
আমাদের শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন দিয়ে তো বেকারত্ব দূর করা সম্ভব না। এ উন্নয়নে প্রবৃদ্ধি নামক সংখ্যার চমক থাকে। কিন্তু এটা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে কতটা সহায়ক, সেটা দেখার বিষয়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতি বছর পাশ করে যে পরিমান শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে বের হচ্ছে- তাদের বেকারত্ব দূর করার জন্যে যে ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা দরকার ছিল, সেই ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেই।
সেই ক্ষেত্রে আমাদের শিল্প উন্নয়ন ও কৃষি উন্নয়ন হচ্ছে না। আমরা কমপারেটিভ অ্যাডভ্যান্টেজের কথা বলে থাকি, সেটা সব সময় কৃষিতে ছিল। আমাদের ভৌগলিক বৈশিষ্ট বিবেচনায় নিলেও কৃষি এগিয়ে। কিন্তু আমরা পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল অনুস্মরণ করতে গিয়ে আমাদের কমপারেটিভ অ্যাডভ্যান্টেজ গুলিয়ে ফেলেছি।
আমরা বেশি মনোযোগী হয়ে উঠলাম আমাদের শ্রমটাকে সস্তা রাখার। স্বস্তা শ্রমটাকে পুঁজি করে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি শিল্প গড়ে তুল্ল। যেখানে কৃষি উপেক্ষিত হলো।
এছাড়া আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে, এই ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আসলে আমাদের জনগোষ্ঠীকে জন সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব না।
আমরা আজও নিশ্চিত করতে পারি নাই যে , আমাদের যে জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠছে সে জনগোষ্ঠীকে কি ধরণের শিক্ষা দিব। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনটা বেশি উপযোগি তাও আমরা নির্ধারণ করতে পারি নাই।
আমাদের যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের উন্নয়ন দর্শনই সমস্যাবহুল। উন্নয়ন শুধু মাত্র সংখ্যা বা প্রবৃদ্ধি দিয়ে হয় না। জীবন মানের যে গুণগত দিক বা বেকারত্ম দূর করার জন্য আমাদের আর্থ-সামাজিক চিত্রের সঙ্গে সামাঞ্জস্ব রেখে কি ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকা উচিত সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেই।
একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমাদের দেশে এতো শিক্ষিত যোগ্য লোক, অথচ পোশাক শিল্পসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিদেশি এক্সপার্টদের বেশি বেতনে আনা হচ্ছে। কেন আমরা সে জায়গাটা নিতে পারছি না?
তানজীম উদ্দীন খান: আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন এক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলছি, যাদের উপর আমরা নিজেরাই ভরসা করতে পারছি না। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বিদেশ থেকে লোকবল আমদানি করছি। আমাদেরও জনশক্তি বিদেশে আছে। তবে সে জনশক্তি অদক্ষ ও সস্তা শ্রমের।
সেদিক থেকে আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করার জন্য যে শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার তার ঘাটতি আছে। আমাদের মূলত কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেয়ার দরকার। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যারা ভাববেন, তাদের বেশির ভাগেরই ছেলে-মেয়ে দেখা যায় বিদেশে লেখা-পড়া করছেন। আবার যারা কলকারখানার মালিক তাদের ছেলে-মেয়েও বেশিরভাগ বিদেশে লেখা-পড়া করছে।
ফলে বলা যায়, আমাদের মধ্যে আমাদের দেশ, শিক্ষা, জনশক্তি কোনটার প্রতি আমাদের নিজেদেরই আস্থা নেই এবং এ আস্থা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও আমরা নিতে পারি নাই। ফলে আমাদের এখানে যারা লেখা পড়া করছে তারা ওই প্রতিষ্ঠানে বড় জোর একজন কর্মকর্তা হতে পারবেন। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের গুরু দায়িত্ব নিতে পারবে না।
একুশে টেলিভিশন অনলাইন: দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন এসেছে। যা নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক শোনা যায়। শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন সংযোজিত সৃজনশীল পদ্ধতি কিভাবে দেখছেন?
তানজীম উদ্দীন খান: প্রচলিত ‘সৃজনশীলতা’ আসলে কতটুকু সৃজনশীল এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিষয়টা হচ্ছে সৃজনশীলতার জন্য যে ধরণের শিক্ষক দরকার। আমার সে ধরণের শিক্ষক তৈরি হয়েছে কি না? সৃজনশীল পড়তে গিয়ে যদি আমাকে আবার বাজারের গাইডের প্রতি আকৃষ্ট হতে হয়, তবে সেটা সৃজনশীর কিভাবে হলো।
আমার বাচ্চা যখন বড় হবে তখন তার তিনটা বিষয় সবচেয়ে বেশি জানানো দরকার। সেটা হলো-ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের দক্ষতা। কিন্তু আমি যদি বাচ্চাকে ১শ’টি বিষয় পড়তে দেয়, তবে সেটার মধ্যে জড়তা চলে আসে। তাকে যদি তিনটা বিষয়কে কেন্দ্র করে পড়তে দেয়।
তবে সে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আবার বিনোদন বা খেলারও সুযোগ পাচ্ছে। ফলে তার লেখা-পড়ায় ভাবার সযোগও সে পাবে। কিন্তু আমরা বাচ্চার উপর ১০ থেকে ১৫টি বই চাপিয়ে দিলে সে হাফিয়ে উঠে। ফলে ভাবার সুযোগ পায় না।
যতটুকু পারে মুখস্থ করার চেষ্টা করে। যার সর্বশেষ পর্যাযে সৃজনশীল আর সৃজনশীল থাকে না। বিদেশে বাচ্চাদের শিক্ষা গ্রহণে সবচেয়ে যেটির উপর গরুত্ব দেওয়া হয়, সেটি হলো বাচ্চার সময়। এখন আমরা বাচ্চাদের যেভাবে টেক্সট বুকের মধ্যে ব্যস্ত রাখি তাতে সৃজনশীল হয় না।
সৃজনশীল করতে হলে শিক্ষকদের সৃজনশীল হতে হবে। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপর পরীক্ষা ও পাঠ্য বইয়ের বোঝা কমাতে হবে। বাচ্চাদের ভাবার সময় দিতে হবে। খেলার সময় দিতে হবে। তাদেরকে পরিবেশ থেকেই শিক্ষা নেয়ার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।এ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাকে নিরেট সেবায় পরিণত করার মূলমন্ত্র কি হতে পারে?
তানজীম উদ্দীন খান: বাণিজ্যের এ অভিযোগ শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর না। এটা বেসরকারি হাসপাতালসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বিদ্যমান। এখন কথা হচ্ছে শিক্ষা তো আসলে ব্যবসা না। শিক্ষা হচ্ছে সামাজিক কল্যাণের একটি উপাদান। সমাজকে এগিয়ে নেয়ার উপাদান। এই উপাদানকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের দরকার সামাজিক ও যৌথ প্রচেষ্টা।
আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার এ বেসরকারিকরণের পক্ষে না। এখন রাষ্ট্র যখন এ কাজটি যথাযথ করতে পারছে না। তখন সে সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশের একটি মজ্জাগত বিষয় হলো সবাই তার ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত করতে চাই। কারণ শিক্ষার মাধ্যমে সবাই তার ভাগ্যকে বদলাতে চাই। ভাগ্য বদলানোর এ সুযোগটা নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় তারা শিক্ষার্থীরা বেসরকারি পর্যায়ে ঝুঁকে পড়ে।

Recent Posts


Card image cap

01 December 2019

শিক্ষার্থীদের সফলতা।

 MD. Shamim

Card image cap

28 October 2019

ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিংয়ে শীর্ষ...

 Ankhi Jannat

Card image cap

28 October 2019

৩ ও ৬ মাস মেয়াদী সরকারি কম্পিউটার স...

 Ankhi Jannat

Card image cap

28 October 2019

BECS-বাংলাদেশ ই-কমার্স সোসাইটি “গ্র...

 Ankhi Jannat

Card image cap

28 October 2019

আমাদের নিয়োগের কার্যক্রম ও বেতন বি...

 Ankhi Jannat